শিশুদের স্কুল ভীতি!একটি উদ্বেগজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা । ডাঃ এম এইচ মোহন

প্রভাষক, ডাঃ এম  এইচ মোহন

স্কুলে যাওয়ার সময় এলেই অনেক শিশুর মধ্যে তীব্র আপত্তি, অনীহা ও উদ্বেগ লক্ষ করা যায়। কিন্তু যখন স্কুলে না যাবার দৃশ্যমান কোনো কারণ যেমন- শারীরিক অসুস্থতা ও পারিবারিক দুর্ঘটনা প্রভৃতি খুঁজে পাওয়া যায় না তখন বিষয়টি অভিভাবক ও স্কুলশিক্ষকের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি শিশুদের একটি উদ্বেগজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যা স্কুলভীতি নামে বেশি পরিচিত।
শিশু মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য আগত শতকরা ৫ ভাগ শিশুর এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণ কিংবা অন্য কোনো পারিবারিক কারণে (প্রিয়জনের মৃত্যু) দীর্ঘদিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ থাকার পর স্কুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ সমস্যা শুরু হতে পারে। শুরুতে স্কুলে যেতে তীব্র আপত্তি, প্রতিবাদ, কান্নাকাটি, হাত-পা ছুড়ে চিৎকার ও আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা যায়। অনেক সময় শুধুমাত্র শারীরিক লক্ষণসমূহ যেমন, পেটে, মাথায় ও শরীরের অন্য স্থানে ব্যথা, অস্থিরতা, বমিভাব ও ক্লান্তি ও অবসাদবোধ নিয়ে স্কুলভীতি প্রকাশ পেতে পারে।
অভিভাবকগণ অনেক সময় এসব কারণে শিশুকে স্কুলে যেতে দেন না বা স্কুলে যাওয়ার মাঝ পথ থেকে শিশুকে ফিরিয়ে আনেন যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
লিঙ্গ ও বয়সভেদে যেকোনো শিশুর স্কুলভীতি বা স্কুলে যেতে সমস্যা হতে পারে। সাধারণত ৭-১১ বছর বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে এ সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। যে বয়সে একটি শিশুর স্বাধীনভাবে একাকী চলাফেরা, খেলাধুলা ও বন্ধুদের সাথে মেলামশার ক্ষমতা থাকার কথা তা যদি না থাকে তখন এ সমস্যা দেখা যায় যা ‘সেপারেশন অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার’ নামক শিশু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নামে পরিচিত। এ ছাড়া, স্কুলে যাওয়ার পথে ভীতিকর পরিবেশ, অতিরিক্তি পড়াশুনার চাপ, পরীক্ষা ভীতি, স্কুলে শিক্ষক বা সহপাঠী দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল প্রভৃতি কারণেও শিশুদের স্কুলে যেতে অনীহা তৈরি হয়। স্কুল পরিবর্তন ও নতুন পরিবেশ, পরিবারে শৃঙ্খলার অভাব, মা-বাবার প্রতি শিশুর অতি নির্ভরশীলতা, শিশুর সাথে পরিবারের নেতিবাচক  সম্পর্ক, শিশু নির্যাতন ও মা-বাবার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শিশুর স্কুলভীতির সাথে নিবিঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।
যে সকল শিশুর স্কুলভীতি রয়েছে তাদের দুই-তৃতীয়াংশের উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, অতি চঞ্চলতা, সামাজিক ভীতি ও মানিয়ে চলার সমস্যাসহ বিভিন্ন ধরনের শিশু মানসিক সমস্যা থাকে। এ জন্য স্কুলভীতির কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকারের জন্য মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞ, শিশু-বিশেষজ্ঞ, মনোবিদসহ অন্যান্য সহায়ক শিশু-মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা অপরিহার্য। গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলভীতির সমস্যার সফল সমাধানে ‘স্কুলে ফিরে যাওয়ার নীতি’ গ্রহণ দুই-তৃতীয়াংশ শিশুর ক্ষেত্রে কার্যকর। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও স্কুল-শিক্ষকের ইতিবাচক ও সহযোগী ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ নীতিতে আগে থেকে সুবিধামতো দিন ঠিক করে শিশুকে কিছু পূর্বপ্রস্তুতির পর স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্কুল চলাকালীন বা অন্য সময় স্কুলের আশপাশে যাওয়া ও পরে স্কুলের ভেতরে প্রবেশ ইত্যাদি কৌশল বের করে।
পড়াশুনায় পিছিয়ে পড়লে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে কোনোভাবেই স্কুল বাদ দিয়ে বাসায় পড়াশুনা উৎসাহিত করা যাবে না।
অন্যান্য মানসিক ও শারীরিক সমস্যার জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। স্কুলভীতির কারণে শিশুর পড়াশুনার দক্ষতা কমে যাওয়া, প্রাপ্তবয়সে বেকারত্ব, মনোদৈহিক রোগ, আতঙ্ক, সামাজিক ভীতিসহ বিভিন্ন মনোসামাজিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ জন্য স্কুলভীতির সমস্যাকে অবহেলা না করে সময়মতো শিশু-মানসিক স্বান্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ ও সহায়তা নিতে হবে।

Comments

Popular posts from this blog

মাসিকের সময় ১২ টি খাবার মহৌষধ

পাইলস হলে লজ্জা পাবেন না